হেফাজতে ইসলামের নারী মনোভাব ঝুঁকিতে ফেলতে যাচ্ছে নারীর ভবিষ্যৎ

নারীর অধিকার কি তার নিজের, নাকি সমাজের কোনো গোষ্ঠী ঠিক করে দেবে একজন নারী কতটুকু পড়বে, কোথায় যাবে, কীভাবে কাজ করবে এবং কীভাবে বাঁচবে?

বাংলাদেশের নারী অধিকারের প্রশ্নে হেফাজতে ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই আর তা হলো নারীর শিক্ষা, স্বাধীনতা ও জনজীবনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে সংগঠনটির উত্থাপিত দাবিগুলো। এটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের গঠন, সাধারন নাগরিকের স্বাধীনতা এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করে।

গত ১৬ই ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদনে হেফাজতে ইসলাম তাদের পুরোনো ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য চাপ তৈরির উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে। প্রতিবেদনে তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করে যে ‘ইসলামবিরোধী’ নারী ও শিক্ষা নীতি পুনরায় তারা বাতিল করার দাবি রাখতে চায়। পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর, ঢাকায় হেফাজতের এক সম্মেলনে নতুন সাত দফা দাবিও তারা উত্থাপন করে। যার মধ্যে শিক্ষাক্রমে ধর্মীয় শিক্ষার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবিও রাখে।

উল্লেখ্য যে, হেফাজত তাদের পুরোনো ১৩ দফা দাবি পুনরায় বাস্তবায়নের কথা যেহেতু বলছিল, সেখানে আমরা সবাই জানি যে নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবি তারা তাদের ২০১৩ সালের ১৩ দফা দাবিতেই রেখেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি সংগঠন যখন নারী উন্নয়ন নীতিকে বাতিল করতে চায় এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজেদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে আরও কঠোরভাবে যুক্ত করতে চায়, তখন নারীশিক্ষা ও নারীর স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া কি অযৌক্তিক?

আমার মতে, এই প্রশ্ন তোলা শুধু যৌক্তিক নয়, প্রয়োজনীয়ও।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে ছিল নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবি, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এবং জনপরিসরে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করার দাবি।

এই দাবিগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা কঠিন। কারণ নারীশিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ নয়। শিক্ষা একজন নারীকে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে, নিজের অধিকার বুঝতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহায্য করে।

একইভাবে, জনপরিসরে নারী-পুরুষের মেলামেশা বন্ধ করার দাবি কেবল সামাজিক শালীনতার প্রশ্ন তুলে তা নয়। এটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, কার চলাফেরার ওপর নজরদারি হবে এবং নিয়ম ভাঙার অভিযোগে কাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে? সেই প্রশ্নও সামনে আনে। যা কি না শুধু মাত্র একটা লিঙ্গের উপরেই আঙ্গুল তুলতে সাহায্য করবে আর সে হলো “নারী”। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব নীতির চাপ নারীদের ওপর অসমভাবে পড়ার আশঙ্কা সব সময়ই  থেকে আসছে। কেননা, সমাজ নারীর পোশাক, চলাফেরা ও সামাজিক উপস্থিতি নারীর স্বাধীনতাকে প্রতিনিয়ত সীমিত করে আসছিল যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ও ক্ষমতা থাকে অন্যের হাতে।

নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুরক্ষার নামে যদি নারীর চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা বা কর্মজীবনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত সুরক্ষা নয়, সেটি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় সমাজকে উৎসাহিত করা।

এখানে কিছু মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে: কোনো নারী কী পড়বেন, কোথায় কাজ করবেন কিংবা জনপরিসরে কীভাবে অংশ নেবেন, সে সিদ্ধান্ত কি তিনি নিজে নেবেন, নাকি কোনো সংগঠনের সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে? 

সেজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ২০১৩ সালেই  হেফাজতের ১৩ দফা দাবির প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এসব দাবি নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজের উন্নয়নে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যা আজও সত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ নারীদের অধিকার নিয়ে বিতর্কে নারীদের নিজেদের কণ্ঠও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা। নারীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আলোচনায় নারীদেরই যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা না থাকে, তাহলে সেই সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার যে হেফাজতে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসালে এবং তাদের দাবি যদি কোনো সরকার গ্রহণ করে, অথবা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সংগঠনটির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা যুক্তিসংগত।

প্রথমত, নারীশিক্ষার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিঃ 

নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবি বাস্তব নীতিতে রূপ নিলে মেয়েদের শিক্ষা, সম-অধিকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের ওপর প্রভাব পড়বে। অথচ, ইসলাম কখনই নারীশিক্ষার বিরোধী করে নি। কিন্ত হেফাজতে ইসলাম তাদের দাবিতে এই নারী শিক্ষাব্যবস্থাকেই ক্ষুণ্ণ করতে চাচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি  তারা কি পারবে নারীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে?

দ্বিতীয়ত, নারীর কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর সামাজিক চাপঃ 

নারী-পুরুষের মেলামেশা সীমিত করার দাবি যদি কর্মক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য জনপরিসরে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে নারীদের স্বাভাবিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে যেসব নারী পরিবার চালানোর জন্য কাজ করেন, তাঁদের ওপর এইসবের প্রভাব গুরুতর ভাবে পরবে। 

তৃতীয়ত, নারীর পোশাক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বাড়বেঃ

যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নৈতিক ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করা হয়, তখন ভিন্ন জীবনধারা বেছে নেওয়া নারীরা সামাজিক চাপ, হয়রানি কিংবা বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হয় এবং পড়তে হবে।

চতুর্থত, নারী-পুরুষের সমান নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ণ হবেঃ

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিৎ সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। নারী বা পুরুষ, ধর্মীয়-ভিন্নধর্মীয় সকলকে রক্ষা করা, যে যেমনই হোক না কেন। কোনো গোষ্ঠীর ব্যাখ্যা যদি সমজে নির্ধারিত করা হয়, সেই গোষ্ঠীর স্বভাবিক স্বাধীনতা সীমিত হওয়াটাই স্বভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। যা রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ ও সমান অধিকারের নীতিই প্রশ্নের মুখে পরে।

ধর্মের নামে নারীর অধিকার সীমিত করার অধিকার কার?

বাংলাদেশের নারীরা বহু দশকের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। এই অগ্রগতি নিখুঁত নয়; বৈষম্য, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো রয়েছে। কিন্তু তার সমাধান কি নারীর স্বাধীনতার পরিসর কমিয়ে দেওয়া?

নারীর নিরাপত্তার জন্য দরকার কার্যকর আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নারীর মর্যাদা রক্ষার অর্থ তাঁকে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। বরং তারা ঘরে থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, চাকরি করবে, রাজনীতি করবে, কিংবা নিজের পছন্দের জীবন বেছে নেবে, একান্তই নারীর সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা, একান্তই  তার নিজ অধিকার।

কেউ ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল জীবন বেছে নিতে চাইলে সেটিও তাঁর অধিকার। কিন্তু একই জীবনধারা অন্য সব নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোন সংগঠনের দাবিতে, ক্ষমতায় থাকার নয়।

মূলত, হেফাজতে ইসলাম যদি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে বাংলাদেশের নারীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, সংগঠনটির প্রকাশিত দাবি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সেগুলোর সম্ভাব্য বাস্তব প্রভাব বিচার করে খুঁজতে হবে।

আজ ২০২২ সালে, তাদের ১৩ দফা দাবি পুনরায় সামনে আনার ঘটনা দেখায়, নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষা নীতি নিয়ে হেফাজতের আপত্তি কেবল অতীতের একটি অধ্যায় ছিল না, সেটি তাদের রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবেও আবার ফিরে এসেছে।

এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের, বিশেষ করে নারী-অধিকারকর্মী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নীতিনির্ধারকদের প্রশ্ন করা উচিত:

  • মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা কি অক্ষুণ্ণ থাকবে?
  • নারীরা কি নিজেদের পোশাক, চলাফেরা ও জীবনধারা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?
  • নারী-পুরুষের সমান নাগরিক অধিকার কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
  • নারী-অধিকার সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের আগে নারীদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে?

এই প্রশ্ন গুলো কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো সম-অধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার জন্য কোনো সংগঠনকে শত্রু ভাবার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তাদের দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা, সেগুলোর পরিণতি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা এবং নিশ্চিত করা যে রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তই নারীদের সমান অধিকারকে খর্ব করবে না।

কারণ নারীর অধিকার কোনো সংগঠনের দেওয়া অনুগ্রহ নয়। একজন নাগরিক হিসেবে এটি তাঁর প্রাপ্য। আর সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া কোনো গোষ্ঠীর নয়। কারোই মামার বাড়ির আব্দারও নয়। 

#hefazateislam #womenrights #Bangladesh 


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *